ইসরায়েলি হামলায় গত বছর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লেবাননের অবকাঠামো ও অন্যান্য খাত। দেশটির যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে ১১ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় সরকারি অর্থায়ন প্রয়োজন ৩০০-৫০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে প্রয়োজন হবে ৬০০-৮০০ কোটি ডলার। খবর আনাদোলু এজেন্সি।
বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থাটি সম্প্রতি লেবাননের ওপর ‘লেবানন র্যাপিড ড্যামেজ অ্যান্ড নিডস অ্যাসেসমেন্ট (আরডিএনএ) ২০২৫’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থা ও পুনর্গঠনের বিভিন্ন পর্যায় বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ থাকবে সরকারি তহবিল। এর পরিমাণ ৩০০-৫০০ কোটি ডলার এতে বিদ্যুৎ, সরকারি ও পৌর পরিষেবা, পরিবহন, পানি, পয়োনিষ্কাশন, সেচের মতো অবকাঠামো খাতের জন্য ১০০ কোটি ডলার খরচ হবে। আবাসন, ব্যবসা, উৎপাদন ও পর্যটনের মতো খাতে বেসরকারি তহবিলের প্রয়োজন হবে। এর আকার হবে ৬০০-৮০০ কোটি ডলার।
বিশ্বব্যাংক বলছে, সংঘাতে লেবাননের অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। যার মধ্যে অবকাঠামো খাতের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৬৮০ কোটি ডলার। সেই সঙ্গে আয় হারিয়ে যাওয়া, উৎপাদনশীলতা হ্রাস ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে ৭২০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।
সংঘাতে অবকাঠামোগত ক্ষতির সবচেয়ে বড় শিকার আবাসন খাত। এ খাতে আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ৪৬০ কোটি ডলার। অর্থাৎ মোট ক্ষতির এক-চতুর্থাংশ। এছাড়া লেবাননজুড়ে বাণিজ্য, শিল্পোৎপাদন ও পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব খাতে সব মিলিয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৪০ কোটি ডলার।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় পূর্ণমাত্রার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব পড়ে সীমান্তবর্তী লেবাননে। ওই সময় লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ইসরায়েল সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদন অনুসারে, সংঘাতের কারণে ২০২৩ সালের তুলনায় গত বছর লেবাননের জিডিপি ৭ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। অথচ সংঘাতের আগে দেশটির প্রবৃদ্ধির হার ছিল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। তবে ২০১৯ সালের সঙ্গে তুলনা করলে ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ লেবাননের জিডিপি ৪০ শতাংশ কমেছে, যা বহুমুখী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। সেই সঙ্গে লেবাননের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকেও প্রভাবিত করেছে।
লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি গত সেপ্টেম্বরে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে পরিণত হয়, যা দুই মাস স্থায়ী হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২৭ নভেম্বর থেকে একটি দুর্বল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েল প্রায় ১ হাজার ১০০ বার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ লেবানিজ কর্তৃপক্ষের। এতে কমপক্ষে ৮৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ২৮০ জন আহত হয়েছেন।
ইসরায়েলের সঙ্গে সর্বশেষ যুদ্ধে লেবাননের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের হিজবুল্লাহর শক্তিশালী এলাকা এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল একটি অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
অবশ্য লেবাননের অর্থনৈতিক সংকট এই প্রথম নয়। কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির সংঘাতের লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছে। যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে লেবানন। এবারের সংঘাত দেশটির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া আরো খরুচে ও দীর্ঘায়িত করল।